কুরআন ও তাওরাতের “সর্বোত্তম কাহিনি” কি পরস্পরের সঙ্গে মেলে?
আগের প্রবন্ধ “মুহাম্মদের সময়ে কি তাওরাত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল?”-এ (এছাড়াও দেখুন “কুরআন কি শিক্ষা দেয় যে তাওরাত বিকৃত হয়েছিল?”) আমরা দেখেছি যে, মুহাম্মদের জীবদ্দশার আগে এবং তাঁর সময়ে প্রচলিত তাওরাতে লিপিবদ্ধ নবীদের কাহিনিগুলোকে কুরআন নির্ভরযোগ্য বলে সত্যায়ন করে। বর্তমানে আমরা যে তাওরাত পড়তে পারি, সেটি যেহেতু মুহাম্মদের সময়ের আগে ও তাঁর সময়ে লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপিগুলোর ভিত্তিতে সংরক্ষিত হয়েছে, তাই আমরা বলতে পারি: বর্তমান তাওরাতই সেই তাওরাতের পাঠকে প্রতিফলিত করে, যার উল্লেখ কুরআনে রয়েছে। তাই এখন আমরা সেটিকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করতে পারি।
এই প্রবন্ধে আমরা বিশেষভাবে ইউসুফের কাহিনি নিয়ে আলোচনা করব। কুরআনে একে “সর্বোত্তম কাহিনি” বলা হয়েছে এবং এই কাহিনি কুরআন ও তাওরাত—উভয় গ্রন্থেই রয়েছে।
সূরা ইউসুফ ১২:৩-এ আল্লাহ মুহাম্মদকে বলেন:
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ ٱلْقَصَصِ بِمَآ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ هَـٰذَا ٱلْقُرْءَانَ وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِۦ لَمِنَ ٱلْغَـٰفِلِينَ
আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করিতেছি, ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করিয়া; যদিও ইহার পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত।
– সুরা ইউসুফ ১২:৩ –
ইহুদিরা বহু শতাব্দী ধরে ইউসুফের কাহিনির সঙ্গে পরিচিত ছিল, কারণ এটি তাদের তাওরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মুহাম্মদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সূরা ইউসুফ ১২:৩ অনুযায়ী, তিনি ছিলেন “এ বিষয়ে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত।” এর অর্থ এই নয় যে, তিনি কাহিনিটি সম্পর্কে একেবারেই কিছু জানতেন না। কারণ তাঁর এমন খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে থাকতে পারে, যারা তাঁকে এই কাহিনি সম্পর্কে বলেছিল। বরং সম্ভবত এর অর্থ হলো, তিনি কাহিনিটির বিস্তারিত বিবরণ জানতেন না। তিনি কীভাবেই-বা এসব বিস্তারিত তথ্য জানতে পারতেন? তিনি ছিলেন একজন নিরক্ষর ব্যক্তি, যিনি নিজে তাওরাত পড়তে পারতেন না।
তবে মুসলিম আলেমদের মতে, পরবর্তীতে একটি মুজিজা ঘটেছিল: মুহাম্মদ প্রায় ১০০ আয়াতজুড়ে ইউসুফের কাহিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। কুরআনে ইউসুফের কাহিনি শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক আয়াত পরে আমরা পড়ি:
لَقَدْ كَانَ فِى قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌۭ لِّأُو۟لِى ٱلْأَلْبَـٰبِ ۗ مَا كَانَ حَدِيثًۭا يُفْتَرَىٰ وَلَـٰكِن تَصْدِيقَ ٱلَّذِى بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَىْءٍۢ وَهُدًۭى وَرَحْمَةًۭ لِّقَوْمٍۢ يُؤْمِنُونَ
উহাদের বৃত্তান্তে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। ইহা এমন বাণী যাহা মিথ্যা রচনা নয়। কিন্তু মু’মিনদের জন্য ইহা পূর্বগ্রন্থে যাহা আছে তাহার প্রত্যয়ন এবং সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত।
– সুরা ইউসুফ ১২:১১১ –
কুরআন দাবি করে যে, এটি তার আগে আসা ধর্মগ্রন্থগুলো—তাওরাতসহ—সত্যায়ন করে। অর্থাৎ কুরআন শুধু তাওরাতে উল্লেখিত সাধারণ বিষয়বস্তু সত্যায়ন করে—এমন নয়। বরং কুরআনকে বলা হয়েছে “সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা”, যার মধ্যে তাওরাতে বর্ণিত কাহিনিগুলোও অন্তর্ভুক্ত। অন্যভাবে বললে, তাওরাতের কাহিনিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরার মাধ্যমে কুরআন তাওরাতকে সত্যায়ন করে। এটিকে মুহাম্মদের ঐশী প্রত্যাদেশ লাভের এবং আল্লাহর সত্য রাসূল হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ একজন নিরক্ষর ব্যক্তি হিসেবে, যিনি নিজে তাওরাত পড়তে পারতেন না, তাঁর পক্ষে এসব কাহিনির বিস্তারিত তথ্য নিজে থেকে জানা সম্ভব ছিল না। সুতরাং কুরআনে বর্ণিত ইউসুফের কাহিনির সঙ্গে তাওরাতে বর্ণিত একই কাহিনি তুলনা করলে আমাদের প্রত্যাশা করা উচিত যে, বিস্তারিত বিবরণেও উভয় কাহিনি পরস্পরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—অথবা অন্তত একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না।
পরবর্তী আলোচনায় আমরা এই কাহিনির দুটি নির্দিষ্ট অংশ পর্যালোচনা করে তাওরাতের বর্ণনার সঙ্গে তুলনা করব:
১) ইউসুফের স্বপ্ন এবং তাঁর ভাইদের ষড়যন্ত্র ২) ইউসুফের কথিত মৃত্যুর সংবাদে ইয়াকুবের প্রতিক্রিয়া
১) ইউসুফের স্বপ্ন এবং তাঁর ভাইদের ষড়যন্ত্র
কুরআনে ইউসুফের কাহিনি (সূরা ইউসুফ ১২:৪–২০) এভাবে শুরু হয়েছে: বালক ইউসুফ তাঁর পিতা ইয়াকুবকে বলেন যে, তিনি স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদকে তাঁর সামনে সিজদা করতে দেখেছেন (১২:৪)। ইয়াকুব তাঁকে এই স্বপ্নের কথা ভাইদের না বলতে পরামর্শ দেন (১২:৫) এবং তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে, আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার ঐশী জ্ঞান দান করবেন (১২:৬)। এরপর ইউসুফের এগারো ভাই নিজেদের মধ্যে বলে যে, তাদের পিতার কাছে ইউসুফ ও তার ভাই তাদের চেয়ে বেশি প্রিয়। তাই তারা ইউসুফকে হত্যা করা অথবা দূরের কোনো স্থানে ফেলে আসার পরিকল্পনা করে, যাতে এরপর তাদের পিতার সমস্ত মনোযোগ শুধু তাদের দিকেই থাকে (১২:৯)। কিন্তু ভাইদের একজন বলে, ইউসুফকে হত্যা না করে বরং কোনো কূপের গভীরে ফেলে দেওয়া হোক, যাতে কোনো পথিকদল তাকে তুলে নিয়ে যায় (১২:১০)। এরপর তারা তাদের পিতা ইয়াকুবের কাছে গিয়ে ইউসুফকে তাদের সঙ্গে বাইরে পাঠানোর অনুমতি চায়, যাতে সে “খেলাধুলা ও আনন্দ করতে পারে।” এমনকি তারা তাকে নিরাপদে দেখাশোনা করার আশ্বাসও দেয় (১২:১২)। ইয়াকুব ভাইদের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছিলেন না (১২:১১)। তাই তিনি দ্বিধা প্রকাশ করেন এবং আশঙ্কা করেন যে, কোনো নেকড়ে ইউসুফকে খেয়ে ফেলতে পারে (১২:১৩)। ভাইয়েরা তাঁকে আশ্বস্ত করে যে, এমন কিছু ঘটবে না (১২:১৪)। এরপর তারা ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে যায় এবং তাকে একটি কূপের গভীরে ফেলে দেয় (১২:১৫)। পরে সেই রাতেই তারা তাদের পিতার কাছে ফিরে আসে (১২:১৬)। ভাইয়েরা বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর একদল ব্যবসায়ী সেই কূপের কাছে আসে। তারা পানি তোলার জন্য একজনকে পাঠালে সে কূপের মধ্যে ইউসুফকে খুঁজে পায়। তারা ইউসুফকে কূপ থেকে তুলে আনে এবং পরে অল্প কয়েকটি রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে মিসরের আল-আজিজের কাছে বিক্রি করে দেয় (১২:১৯–২১)।
এ পর্যন্ত হলো কুরআন অনুযায়ী কাহিনিটির শুরুর অংশ। এবার দেখা যাক, তাওরাতে কাহিনিটি কীভাবে বর্ণিত হয়েছে (দেখুন আদিপুস্তক ৩৭)।
ইউসুফের বয়স তখন ১৭ বছর (৩৭:২)। তার এগারো বড় ভাই তাকে ঘৃণা করত, কারণ তাদের পিতা অন্য সবার চেয়ে ইউসুফকে বেশি ভালোবাসতেন। এমনকি তিনি ইউসুফের জন্য বিশেষ একটি রঙিন পোশাকও তৈরি করে দিয়েছিলেন (৩৭:৩–৪)। একদিন ইউসুফ একটি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি ও তাঁর ভাইয়েরা মাঠে শস্যের আঁটি বাঁধছিলেন। হঠাৎ ইউসুফের আঁটিটি উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, আর তাঁর ভাইদের আঁটিগুলো সেটির চারপাশে জড়ো হয়ে তার সামনে নত হয়। এই স্বপ্নের কারণে ভাইয়েরা ইউসুফকে আরও বেশি ঘৃণা করতে শুরু করে (৩৭:৫–৮)।
এরপর ইউসুফ আরেকটি স্বপ্ন দেখেন। এবার তিনি দেখেন, সূর্য, চাঁদ ও এগারোটি নক্ষত্র তাঁর সামনে নত হচ্ছে (৩৭:৯)। এবার তিনি শুধু ভাইদের কাছেই নয়, তাঁর পিতার কাছেও স্বপ্নটির কথা বলেন। তাঁর পিতা এই স্বপ্নের জন্য তাঁকে তিরস্কার করেন (৩৭:১০)। একদিন ইউসুফের ভাইয়েরা তাদের পশুপাল চরাতে শিখিম নামের একটি স্থানে যায়, যা ইয়াকুবের বাড়ি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার (প্রায় ৫০ মাইল) দূরে ছিল। কিছুদিন পর এত দূরে থাকা ছেলেরা কেমন আছে তা নিয়ে ইয়াকুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাই তিনি ইউসুফকে তাদের খুঁজে বের করতে এবং ভাইদের কুশলসংবাদ নিয়ে ফিরে আসতে পাঠান (৩৭:১২–১৪)। প্রথমে ইউসুফ তাদের খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরে ওই এলাকার একজন ব্যক্তির কাছ থেকে জানতে পারেন যে, তাঁর ভাইয়েরা শিখিম থেকেও আরও দূরে দোথান নামের একটি স্থানে চলে গেছে (৩৭:১৫–১৭)। ভাইয়েরা দূর থেকে ইউসুফকে আসতে দেখে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় (৩৭:১৮–২০)। কিন্তু রূবেন নামের একজন ভাই ইউসুফের জীবন রক্ষা করতে চায়। সে প্রস্তাব দেয়, তাকে হত্যা না করে পানিশূন্য একটি গর্তে ফেলে দেওয়া হোক (৩৭:২১–২২)। ইউসুফ কাছে এলে তারা তার বিশেষ রঙিন পোশাকটি খুলে নেয় এবং তাকে সেই গর্তে ফেলে দেয় (৩৭:২৩–২৪)। এরপর তারা মিসরের দিকে যাওয়া একদল ব্যবসায়ীর কাফেলা দেখতে পায় (৩৭:২৫)। তখন তারা ইউসুফকে আবার গর্ত থেকে তুলে বিশটি রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে সেই ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত ইউসুফকে মিসরে নিয়ে যায়। পিতাকে প্রতারিত করার জন্য ভাইয়েরা একটি ছাগল জবাই করে এবং ইউসুফের পোশাকটি সেই পশুর রক্তে ডুবিয়ে দেয়। এরপর তারা বাড়ি ফিরে রক্তমাখা পোশাকটি পিতার সামনে উপস্থাপন করে, যাতে তিনি মনে করেন কোনো বন্য প্রাণী ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে।
এ পর্যন্ত হলো তাওরাতে বর্ণিত কাহিনি। এখন আমাদের প্রশ্ন করতে হবে: এই বর্ণনা কি কুরআনের বর্ণনার সঙ্গে মেলে? প্রিয় পাঠক, আপনি সম্ভবত ইতোমধ্যেই লক্ষ করেছেন যে, দুটি বর্ণনার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে পার্থক্য থাকলেই যে তা সমস্যা সৃষ্টি করবে, এমন নয়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে ইউসুফ তাঁর ভাইদের সামনে শুধু একটি স্বপ্নের কথা বলেন সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের স্বপ্ন। অন্যদিকে, তাওরাতে দুটি স্বপ্নের কথা রয়েছে সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের স্বপ্নের পাশাপাশি শস্যের আঁটির স্বপ্নও রয়েছে। কিন্তু কুরআনে শস্যের আঁটির স্বপ্নটির উল্লেখ না থাকার অর্থ এই নয় যে, কুরআন দাবি করছে এমন কোনো স্বপ্ন কখনো ঘটেনি। এই জায়গায় দুটি বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু সেগুলো আবশ্যিকভাবে পরস্পরবিরোধী নয়। তাই এখানে কোনো সমস্যা হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে আরও কিছু পার্থক্যের ক্ষেত্রে দুটি বর্ণনাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। নিচে এমন কয়েকটি পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
১. ইউসুফের বয়স: কুরআনের বর্ণনায় ইউসুফকে একজন অল্পবয়সী বালক হিসেবে দেখা যায়। এর একটি ইঙ্গিত হলো, তাঁর ভাইয়েরা বলে যে সে বাইরে গিয়ে “খেলাধুলা” করতে পারবে এবং তারা তাকে দেখাশোনা করবে (১২:১২)। মুসলিম আলেমদের মতে, তখন তাঁর বয়স সাত থেকে নয় বছরের মধ্যে ছিল। অন্যদিকে, তাওরাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইউসুফের বয়স তখন ১৭ বছর (৩৭:২)—এমন একটি বয়স, যখন তিনি একাই কয়েক দিনের পথ পাড়ি দিয়ে ভাইদের খুঁজতে যেতে সক্ষম ছিলেন।
২. স্বপ্নের কথা কাদের বলা হয়েছিল: কুরআনে ইউসুফ ব্যক্তিগতভাবে শুধু তাঁর পিতাকে স্বপ্নের কথা বলেন এবং তাঁর পিতা স্বপ্নটির বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো আপত্তি করেন না। অন্যদিকে, তাওরাতে ইউসুফ তাঁর প্রথম স্বপ্নের কথা ভাইদের বলেন। পরে সূর্য, চাঁদ ও এগারোটি নক্ষত্রের দ্বিতীয় স্বপ্নটির কথা তিনি শুধু পিতাকেই নয়, ভাইদেরও জানান। তাঁর পিতা ইয়াকুব এই স্বপ্নের কথা বলায় অসন্তুষ্ট হন এবং ভাইদের উপস্থিতিতেই তাঁকে তিরস্কার করেন।
৩. ঘটনাপ্রবাহ ও স্থান: উভয় বর্ণনায় ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং ঘটনাস্থলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কুরআনের বর্ণনায় ভাইয়েরা প্রথমে বাড়িতে থাকে (১২:৮–১০)। সেখানেই তারা ইউসুফকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে এবং তাদের পিতাকে রাজি করানোর চেষ্টা করে, যাতে তিনি ইউসুফকে তাদের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেন। প্রথমে ইয়াকুব তাদের বিশ্বাস করতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেন। এরপর তারা ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে যায়, তাকে কূপে ফেলে দেয় এবং সেই দিন রাতেই বাড়ি ফিরে আসে (১২:১৬)।
এর বিপরীতে, তাওরাতের বর্ণনায় ভাইয়েরা তখন বাড়িতে ছিল না। তারা দোথানে, বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার (প্রায় ৬০ মাইল) দূরে ছিল—যেখানে পৌঁছাতে কয়েক দিনের যাত্রা প্রয়োজন হতো। আর ইউসুফ তখন বাড়িতেই ছিলেন (নিচের চিত্র ১ দেখুন)। ভাইয়েরা ইয়াকুবকে ইউসুফকে তাদের সঙ্গে পাঠানোর জন্য রাজি করায়নি। বরং ইয়াকুব নিজ উদ্যোগেই ইউসুফকে ভাইদের খুঁজে বের করতে পাঠিয়েছিলেন। একইভাবে, ভাইয়েরা বাড়িতে বসে ইউসুফকে হত্যা করার পরিকল্পনাও করেনি। বরং দোথানে পশুপাল চরানোর সময় তারা দূর থেকে ইউসুফকে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। এরপর ইউসুফকে গর্তে ফেলার পর তারা সেই দিনই বাড়ি ফিরে যায়নি; বরং কয়েক দিন পর বাড়িতে ফিরে আসে।

২) ভাইয়েরা ইয়াকুবকে জানায় যে ইউসুফ মারা গেছে
কুরআনের ১৬–১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَجَآءُوٓ أَبَاهُمْ عِشَآءًۭ يَبْكُونَ ١٦
قَالُوا۟ يَـٰٓأَبَانَآ إِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَتَرَكْنَا يُوسُفَ عِندَ مَتَـٰعِنَا فَأَكَلَهُ ٱلذِّئْبُ ۖ وَمَآ أَنتَ بِمُؤْمِنٍۢ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَـٰدِقِينَ ١٧
وَجَآءُو عَلَىٰ قَمِيصِهِۦ بِدَمٍۢ كَذِبٍۢ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًۭا ۖ فَصَبْرٌۭ جَمِيلٌۭ ۖ وَٱللَّهُ ٱلْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ ١٨
[১৬] উহারা রাত্রির প্রথম প্রহরে কাঁদিতে কাঁদিতে উহাদের পিতার নিকট আসিল।
[১৭] উহারা বলিল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করিতেছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রাখিয়া গিয়াছিলাম, অতঃপর নেকড়ে বাঘ তাহাকে খাইয়া ফেলিয়াছে; কিন্তু তুমি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করিবে না, যদিও আমরা সত্যবাদী।’
[১৮] উহারা তাহার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করিয়া আনিয়াছিল। সে বলিল, ‘না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনী সাজাইয়া দিয়াছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যাহা বলিতেছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।
– সুরা ইউসুফ ১২:১৬-১৮ –
তাওরাতে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
[৩১] এরপর তারা ইউসুফের পোশাকটি নিল, একটি ছাগল জবাই করল এবং সেই রক্তে পোশাকটি ডুবিয়ে দিল।
[৩২] তারপর তারা সেই রঙিন পোশাকটি তাদের পিতার কাছে নিয়ে এসে বলল, “আমরা এটি খুঁজে পেয়েছি। দয়া করে দেখে বলুন, এটি আপনার ছেলের পোশাক কি না।”
[৩৩] তিনি পোশাকটি চিনতে পেরে বললেন, “এটি আমার ছেলের পোশাক। কোনো হিংস্র প্রাণী তাকে খেয়ে ফেলেছে। নিঃসন্দেহে ইউসুফকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়েছে।”
[৩৪] এরপর ইয়াকুব নিজের পোশাক ছিঁড়ে ফেললেন, কোমরে শোকের চট পরলেন এবং বহু দিন ধরে তাঁর ছেলের জন্য শোক করলেন।
[৩৫] তাঁর সব ছেলে ও মেয়ে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এগিয়ে এল, কিন্তু তিনি সান্ত্বনা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বললেন, “না, আমি শোক করতে করতেই আমার ছেলের কাছে শেওলে নেমে যাব।” এভাবে তাঁর পিতা তাঁর জন্য কাঁদতে থাকলেন।
— আদিপুস্তক ৩৭:৩১–৩৫ —
আবারও আমাদের প্রশ্ন করতে হবে: দুটি বর্ণনার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য রয়েছে? আর যদি থাকে, তাহলে সেগুলো কি পরস্পরবিরোধী, নাকি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? একটি পার্থক্য দেখা যায় সূরা ইউসুফ ১২:১৭-এ। সেখানে বলা হয়েছে, একটি “নেকড়ে” ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে, তাওরাতে বলা হয়েছে, কোনো “হিংস্র প্রাণী” তাকে খেয়ে ফেলেছে। তবে নেকড়ে যেহেতু একটি হিংস্র প্রাণী, তাই এ ক্ষেত্রে কুরআনের বক্তব্য তাওরাতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। এই পার্থক্যটি সহজেই সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
তবে এবার নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
১. কুরআনের “নেকড়ে” এবং তাওরাতের “হিংস্র প্রাণী”-কে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা গেলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থেকে যায়। কুরআনে ভাইয়েরাই বলে যে, নেকড়ে ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু তাওরাতে ভাইয়েরা শুধু রক্তমাখা পোশাকটি ইয়াকুবকে দেখায়; এরপর ইয়াকুব নিজেই বলেন যে, কোনো প্রাণী ইউসুফকে খেয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ এই কথা ভাইয়েরা নয়, ইয়াকুব বলেন।
২. দুটি বর্ণনায় ইয়াকুব কি মনে করেছিলেন যে ইউসুফ জীবিত, নাকি মৃত? সূরা ইউসুফ ১২:১৮-এ ইয়াকুব তাঁর ছেলেদের বলেন: “বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি বিষয়কে সুশোভিত করে দিয়েছে।” অর্থাৎ তিনি তাদের বর্ণিত ঘটনা বিশ্বাস করেননি। অন্যদিকে, তাওরাতে ইয়াকুব বলেন, ইউসুফ “নিঃসন্দেহে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে” (৩৭:৩৩)। তিনি নিজের পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন, বহু দিন ধরে শোক করেন এবং তাঁর সব সন্তান তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি সান্ত্বনা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন (৩৭:৩৪–৩৫)।
________________________________________
এ পর্যন্ত আমাদের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি?
প্রবন্ধের শুরুতে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, কুরআন দাবি করে যে এটি তাওরাতকে এমনকি তার বিস্তারিত বিবরণের ক্ষেত্রেও সত্যায়ন করে (সূরা ইউসুফ ১২:১১১), যা কুরআনের নিজস্ব ঐশী উৎসের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
কিন্তু আমাদের আলোচনায় উভয় গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনির মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। কুরআন ও তাওরাতের কাহিনিতে একই চরিত্র এবং মোটামুটি একই ধরনের কিছু বিষয়বস্তু থাকলেও লেখকের যুক্তি অনুযায়ী, দুটি বর্ণনা একই কাহিনির অভিন্ন বিবরণ নয় এবং একই লেখকের কাছ থেকে এসেছে বলেও মনে হয় না। আর আমরা যে উদাহরণগুলো পর্যালোচনা করেছি, সেগুলোই এই দুই বর্ণনার মধ্যে একমাত্র পার্থক্য নয়। প্রবন্ধের শেষে মোট ৪০টি পার্থক্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে—এবং এর বাইরেও আরও কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে (দেখুন সারণি ১)।
তাহলে প্রশ্ন আসে: এসব পার্থক্যের উৎপত্তি কি এমন হতে পারে যে, ইহুদি লিপিকাররা তাওরাতের পাঠে হস্তক্ষেপ করে এর কাহিনি পরিবর্তন করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা যাক:
১. আগের একটি প্রবন্ধে আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি যে, কুরআন নিজেই সপ্তম শতাব্দীর তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে। আর আমাদের কাছে যেহেতু মুহাম্মদের জন্মেরও কয়েক শতাব্দী আগের তাওরাতের পাণ্ডুলিপি রয়েছে, তাই অবিকৃত তাওরাতের পাঠ কেমন ছিল, তা নির্ণয় করা সম্ভব।
২. এরপরও যদি আমরা ধরে নিই যে তাওরাত বিকৃত করা হয়েছিল যদিও লেখকের যুক্তি অনুযায়ী তা কুরআনের কর্তৃত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে তাহলে প্রশ্ন করতে হবে: নিজেদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের এমন সব তুচ্ছ বিষয়ে পরিবর্তন আনার জন্য ইহুদিদের উদ্দেশ্য কী হতে পারত? যদি তারা কাহিনির এমন কোনো বিষয় পরিবর্তন করত, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য পূরণ হতো যেমন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক বা নৈতিক বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা তাহলে কেন তারা তা করে থাকতে পারে, সে বিষয়ে অন্তত একটি যুক্তি দাঁড় করানো যেত। কিন্তু নিচের মতো ছোটখাটো বিষয়গুলো তারা কেন পরিবর্তন করবে?
ক) ইউসুফ তাঁর স্বপ্নের কথা কাকে বা কাদের বলেছিলেন
খ) ইউসুফের স্বপ্ন শুনে ইয়াকুব কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন
গ) বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলে যাওয়া-আসার দূরত্ব কত ছিল
ঘ) ইউসুফকে নেকড়ে খেয়েছে এই কথা প্রথম কে বলেছিল
ঙ) ইউসুফের বয়স কত ছিল
চ) রক্তমাখা পোশাক দেখে ইয়াকুব কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন
নিজেদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের শত শত অনুলিপিতে একই ধরনের পরিবর্তন সমন্বিতভাবে ঘটানো সহজ বিষয় নয় বিশেষত যখন সেই অনুলিপিগুলো তিনটি ভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে ছিল এবং সেগুলোর কিছু এমন ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছেও ছিল, যাদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ ছিল। এমন ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানোর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী কোনো উদ্দেশ্য থাকার কথা। কিন্তু এত ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন বিষয় পরিবর্তন করা সেই ধরনের যথেষ্ট উদ্দেশ্য বলে মনে হয় না।
তবে কেউ বলতে পারেন, ইহুদিরা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাহিনি পরিবর্তন না করে থাকে? যদি পরিবর্তনগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে থাকে অর্থাৎ তারা পাঠ পরিবর্তন করতে চায়নি, বরং অনুলিপি করার সময় ভুল করেছে?
এই সম্ভাবনাটিও সমর্থন করা কঠিন। কারণ আবিষ্কৃত তাওরাতের প্রাচীন অনুলিপিগুলো পরস্পরের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। লিপিকাররা মাঝেমধ্যে কিছু ভুল করলেও সামগ্রিকভাবে তারা অসাধারণ নিখুঁততা ও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই গ্রন্থের কাহিনির পার্থক্য শুধু এমন ছোটখাটো বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়, যেগুলো অনিচ্ছাকৃত অনুলিপিগত ভুল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বরং ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতাতেও পার্থক্য রয়েছে। কাহিনি দুটির মৌলিক কাঠামোই উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। তাই এসব পার্থক্য শুধু অনুলিপি করার সময় অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে সৃষ্টি হয়েছে এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা কঠিন।
কুরআন ও তাওরাতে নবীদের কাহিনিগুলোর মধ্যে এত পার্থক্য কেন রয়েছে এর সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যা সম্ভবত এই যে, মুহাম্মদ ছিলেন নিরক্ষর। তিনি হিব্রু ভাষায় তাওরাত পড়তে পারতেন না। ফলে মদিনার ইহুদিরা নবীদের কাহিনি সম্পর্কে তাঁকে যা বলেছিল, তা তিনি নিজে তাওরাত পড়ে যাচাই করতে পারতেন না।
প্রিয় পাঠক, পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা আরেকটি কাহিনি পর্যালোচনা করব যেটি ইসলামের আরও কেন্দ্রীয় একটি বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত: মক্কায় ইবরাহিম ও ইসমাইলের কাবা নির্মাণের কাহিনি। অনুগ্রহ করে পরবর্তী প্রবন্ধটি পড়ুন: