কুরআন ও তোরাহ

পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলো কি আজও মুসলিমদের জন্য প্রাসঙ্গিক?

কুরআনের মৌলিক দাবিগুলো কীভাবে তাওরাতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে

“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল” (مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ)। এটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। মুহাম্মদ কেবল বহু রাসূলের মধ্যে একজন নন; ইসলামে তাঁর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁকে মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাপ্রাপ্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামি পণ্ডিত আত-তাহাবির ভাষায়, তিনি হলেন— “আল্লাহভীরুদের ইমাম, সকল রাসূলের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত এবং সমগ্র জগতের প্রতিপালকের প্রিয়জন।”

কিছু হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহ ১,২৪,০০০ নবী পাঠিয়েছেন। ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই অসংখ্য নবীর মধ্যে মুহাম্মদ সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী। তাঁর আগমনের মাধ্যমে ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাসহ আল্লাহর পূর্ববর্তী সকল রাসূলের ধারাবাহিকতা পূর্ণতা লাভ করেছে। এ কারণেই কুরআনে তাঁকে যথার্থভাবেই “নবীদের মোহর” বা “সর্বশেষ নবী” বলা হয়েছে।

পূর্ববর্তী নবীদের নির্দিষ্ট কোনো গোত্র বা জাতির কাছে পাঠানো হয়েছিল যেমন, মুসাকে পাঠানো হয়েছিল ইহুদিদের কাছে। অন্যদিকে, মুহাম্মদের বার্তা ছিল সমগ্র বিশ্বের জন্য। “বিশ্বজগতের জন্য রহমত” হিসেবে তাঁর মাধ্যমে দেওয়া বার্তা ছিল চূড়ান্ত ও সর্বজনীন বিধান, যা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। ফলে এরপর আর নতুন কোনো ঐশী প্রত্যাদেশের প্রয়োজন নেই।

কুরআনে প্রকাশিত আল্লাহর বাণী যেহেতু সমগ্র মানবজাতির জন্য তাঁর চূড়ান্ত বার্তা, তাই আল্লাহর পূর্বে নাজিল করা ধর্মগ্রন্থগুলো—মুসাকে দেওয়া তাওরাত, দাউদকে দেওয়া যাবুর এবং ঈসাকে দেওয়া ইঞ্জিল—বর্তমান সময়ে তুলনামূলকভাবে কম প্রাসঙ্গিক বলে মনে হতে পারে। তাহলে যার কাছে কুরআন রয়েছে, একজন মুসলিমের কি এসব গ্রন্থ নিয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন আছে? বাজারে যখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নতুন ফোন পাওয়া যায়, তখন পুরোনো একটি ফোন নিয়ে কে-ই বা আগ্রহী হবে? একইভাবে, যখন পরবর্তী ও চূড়ান্ত ধর্মগ্রন্থ—কুরআন—রয়েছে, তখন পুরোনো ধর্মগ্রন্থগুলো নিয়ে কেন ভাবতে হবে?

কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়। প্রথম দেখায় যতটা মনে হয়, পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলো আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।

________________________________________

পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলো কেন এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় সূরা আশ-শু‘আরায়।

এই সূরার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মক্কার অবিশ্বাসীরা মুহাম্মদকে মিথ্যা নবী বলে অভিযুক্ত করেছিল। এর জবাবে আল্লাহ তাঁর সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬ নম্বর আয়াত নাজিল করেন:

وَإِنَّهُۥ لَفِى زُبُرِ ٱلْأَوَّلِينَ

পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে অবশ্যই ইহার উল্লেখ আছে

- সুরা আস-শুআরা ২৬:১৯৬ –

আল্লাহ অবিশ্বাসীদের সেই সময়ে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের দিকে দৃষ্টি দিতে বলেছিলেন—তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিলের দিকে। অবিশ্বাসীরা যদি এসব গ্রন্থ পড়ত, তাহলে তারা বুঝতে পারত যে কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং মুহাম্মদ একজন সত্য নবী।

এ কারণেই সূরা আল-বাকারায় অবিশ্বাসীদের তাদের অবিশ্বাসের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে এবং নিন্দা করা হয়েছে। কারণ, তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তারা মুহাম্মদকে অনুসরণ করেনি।

وَلَمَّا جَآءَهُمْ كِتَـٰبٌۭ مِّنْ عِندِ ٱللَّهِ مُصَدِّقٌۭ لِّمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا۟ مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ فَلَمَّا جَآءَهُم مَّا عَرَفُوا۟ كَفَرُوا۟ بِهِۦ ۚ فَلَعْنَةُ ٱللَّهِ عَلَى ٱلْكَـٰفِرِينَ

তাহাদের নিকট যাহা আছে আল্লাহ্র নিকট হইতে যখন তাহার প্রত্যায়নকারী কিতাব আসিল; যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তাহারা ইহার সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করিত, তবুও তাহারা যাহা জ্ঞাত ছিল উহা যখন তাহাদের নিকট আসিল তখন তাহারা উহা প্রত্যাখ্যান করিল। সুতরাং কাফিরদের প্রতি আল্লাহ্ লা’নত।

– সুরা আল-বাকারা ২:৮৯–

কিন্তু পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলো দেখলে অবিশ্বাসীরা কীভাবে বুঝতে পারত যে মুহাম্মদ একজন সত্য নবী?

এর উত্তর দুটি শব্দে দেওয়া যায়: “কাহিনি” এবং “ভবিষ্যদ্বাণী।”

১) নবীদের কাহিনি

সূরা ইউনুস ১০:৩৭-এ বলা হয়েছে:

وَمَا كَانَ هَـٰذَا ٱلْقُرْءَانُ أَن يُفْتَرَىٰ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَلَـٰكِن تَصْدِيقَ ٱلَّذِى بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ ٱلْكِتَـٰبِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ ٱلْعَـٰلَمِينَ

এই কুরআন আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারও রচনা নয়। পক্ষান্তরে, ইহার পূর্বে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে ইহা তাহার সমর্থন এবং ইহা বিধানসমূহের বিশদ ব্যাখ্যা। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইহা জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে।

– সুরা ইউনুস ১০:৩৭–

এই আয়াত অনুযায়ী, কুরআনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত বাণী হিসেবে চেনা যায়, কারণ এটি পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোকে সত্যায়ন করে এবং সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করে। কিন্তু কীসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা?

এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের এই আয়াতের প্রেক্ষাপট দেখতে হবে।

সূরা ইউনুসে নবীদের বিভিন্ন কাহিনি রয়েছে। যেমন—নুহ ও মহাপ্লাবনের ঘটনা (আয়াত ৭১–৭৩) এবং ফিরআউনের সামনে মুসা ও হারুনের ঘটনা (আয়াত ৭৫–৯২)। এসব কাহিনি সর্বপ্রথম মুসাকে দেওয়া তাওরাতে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। সুতরাং আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, “[পূর্ববর্তী] ধর্মগ্রন্থের বিস্তারিত ব্যাখ্যা” বলতে বোঝানো হয়েছে কুরআন তাওরাতে বর্ণিত নবীদের কাহিনির বিস্তারিত বিবরণকে সত্যায়ন করে।

একই ধারণা আমরা আবার সূরা ইউসুফ ১২:১১১-এ দেখতে পাই:

لَقَدْ كَانَ فِى قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌۭ لِّأُو۟لِى ٱلْأَلْبَـٰبِ ۗ مَا كَانَ حَدِيثًۭا يُفْتَرَىٰ وَلَـٰكِن تَصْدِيقَ ٱلَّذِى بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَىْءٍۢ وَهُدًۭى وَرَحْمَةًۭ لِّقَوْمٍۢ يُؤْمِنُونَ

উহাদের বৃত্তান্তে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। ইহা এমন বাণী যাহা মিথ্যা রচনা নয়। কিন্তু মু’মিনদের জন্য ইহা পূর্বগ্রন্থে যাহা আছে তাহার প্রত্যয়ন এবং সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত।

– সুরা ইউসুফ ১২:১১১–

সূরা ইউসুফে সমগ্র কুরআনের মধ্যে কোনো একজন নবীর সবচেয়ে বিস্তারিত ও দীর্ঘ ধারাবাহিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে আর তা হলো ইউসুফের কাহিনি। ১১১ নম্বর আয়াতে কুরআন দাবি করে যে, এই কাহিনিসহ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত অন্যান্য নবীর কাহিনিকেও এটি সত্যায়ন করে। কুরআনকে বলা হয়েছে “সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা” অর্থাৎ ইউসুফ ও অন্যান্য নবীর কাহিনির বিস্তারিত বিবরণ এটি বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরে।

বিষয়টি বিস্ময়কর, কারণ মুহাম্মদ ছিলেন নিরক্ষর! একজন নিরক্ষর মানুষ কীভাবে এমন একটি গ্রন্থ উপস্থাপন করতে পারলেন, যার বিস্তারিত বিবরণ পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে তিনি নিজে সেগুলো পড়ে যাচাই করার সুযোগই পাননি? অবিশ্বাসীদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত ছিল যে, ঐশী প্রত্যাদেশ ছাড়া তাঁর পক্ষে এসব বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব ছিল না।

২) মুহাম্মদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী

কুরআন শুধু এই দাবিই করে না যে, এটি পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত কাহিনিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ সত্যায়ন করে; বরং আরও দাবি করে যে, মুহাম্মদের সময়ে আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে পূর্বে ঘোষিত ভবিষ্যদ্বাণী খুঁজে পেতে পারত।

ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِىَّ ٱلْأُمِّىَّ ٱلَّذِى يَجِدُونَهُۥ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِى ٱلتَّوْرَىٰةِ وَٱلْإِنجِيلِ

‘যাহারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাওরাত ও ইন্জীল, যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহাতে লিপিবদ্ধ পায়, […]

– সুরা আল-আ’রাফ ৭:১৫৭–

মুহাম্মদের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগেই যদি পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোতে তাঁর আগমনের কথা ঘোষণা করা হয়ে থাকে, তাহলে অবিশ্বাসীদের কাছে তিনি যে সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছেন এ কথা বিশ্বাস করার জোরালো কারণ থাকার কথা।

________________________________________

এ পর্যন্ত আমাদের আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয় যে, কুরআনের সত্যতা ও ঐশী উৎস সম্পর্কে যে দাবি করা হয় এবং সেই সূত্রে মুহাম্মদের নবুওয়াতের দাবিও—তা পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত (নিচের চিত্র ১ দেখুন)।

![]( “চিত্র ১: কুরআন পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থ—তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিলের—ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।”)

তবে বর্তমানে কেউ যদি তাওরাত, যাবুর ও ইঞ্জিল পড়ে মুহাম্মদ ও কুরআনের দাবিগুলো যাচাই করতে চান, তাহলে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ইসলামি পণ্ডিতের মতে, ইঞ্জিল হারিয়ে গেছে। আর তাওরাত ও যাবুর সম্পর্কে অনেক মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, এগুলো বিকৃত হয়েছে। তাদের মতে, আল্লাহ যখন এসব কিতাব নাজিল করেছিলেন, তখন সেগুলো সম্পূর্ণ পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ—বিশেষ করে ইহুদিরা—এগুলোর মধ্যে পরিবর্তন এনেছে এবং নিজেদের কিছু মিথ্যা মানবীয় ধারণা এর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। এ কারণে বর্তমানে প্রচলিত তাওরাত ও যাবুরের বক্তব্যকে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হয় না।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কি যুক্তিসংগত? পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতা বা অনির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে কুরআন কী বলে, তার ওপর আলোকপাত করব। বিষয়টি জানার জন্য, প্রিয় পাঠক, আপনাকে পরবর্তী প্রবন্ধটি পড়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি: