কুরআন ও তোরাহ

মুহাম্মদের সময়ে কি তাওরাত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল?

কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আয়াত পর্যালোচনা

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাবিশ্বে বিদ্যমান সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব হলো কুরআন। এটি আল্লাহর ইচ্ছার প্রকাশ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিজা।

তবে কুরআনের এই সর্বোচ্চ মর্যাদা সত্ত্বেও আরও একটি কিতাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর সেটি হলো তাওরাত।

ইসলামের প্রধান চারটি কিতাব তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও কুরআন এর মধ্যে তাওরাতই সর্বপ্রথম আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছিল। এতে এমন অনেক মৌলিক কাহিনি রয়েছে, যেগুলো কুরআনেও পাওয়া যায়। যেমন জান্নাতে আদম ও হাওয়ার ঘটনা, নুহ ও মহাপ্লাবনের কাহিনি এবং মিসরে ইউসুফের ঘটনা। তাওরাত নাজিল হয়েছিল মুসার ওপর, যিনি কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নবী এবং কুরআনে সর্বাধিকবার উল্লেখিত নবী।

তবে অধিকাংশ মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, বর্তমানে আমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে, সেটি আর আল্লাহর নাজিল করা মূল ও বিশুদ্ধ ওহি নয়—এটি বিকৃত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এর পাঠে পরিবর্তন এনেছে এবং আল্লাহর নাজিল করা বাণীর সঙ্গে নিজেদের কিছু মিথ্যা মানবীয় ধারণা মিশিয়ে দিয়েছে। তাই বর্তমানে প্রচলিত তাওরাতকে আর নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয় না।

এই প্রবন্ধে আমরা তাওরাত বিকৃত হয়েছে এই দাবিটি সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করব। আমাদের মূল প্রশ্ন হলো: কুরআন নাজিল হওয়ার সময় তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে কুরআন কী বলে? মুহাম্মদের সময়ে, অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে, যে তাওরাত প্রচলিত ছিল, কুরআন কি সেটিকে বিকৃত বলে উল্লেখ করেছে, নাকি নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে? চলুন, বিষয়টি একসঙ্গে খুঁজে দেখি।

১) সূরা আল-বাকারা — “তোমাদের কাছে যা রয়েছে তার সত্যায়নকারী”

প্রথমে আমরা সূরা আল-বাকারা ২:৪০–৪১-এর দিকে নজর দেব:

يَـٰبَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ ٱذْكُرُوا۟ نِعْمَتِىَ ٱلَّتِىٓ أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَوْفُوا۟ بِعَهْدِىٓ أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّـٰىَ فَٱرْهَبُونِ ٤٠

وَءَامِنُوا۟ بِمَآ أَنزَلْتُ مُصَدِّقًۭا لِّمَا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوٓا۟ أَوَّلَ كَافِرٍۭ بِهِۦ ۖ وَلَا تَشْتَرُوا۟ بِـَٔايَـٰتِى ثَمَنًۭا قَلِيلًۭا وَإِيَّـٰىَ فَٱتَّقُونِ ٤١

[৪০] হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর যদ্দ্বারা আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করিয়াছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করিব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।

[৪১] আমি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছি তোমরা তাহাতে ঈমান আন। ইহা তোমাদের নিকট যাহা আছে উহার প্রত্যায়নকারী। আর তোমরাই উহার প্রথম প্রত্যাখ্যানকারী হইও না এবং আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করিও না। তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।

– সুরা আল-বাকারা ২:৪০-৪১ –

প্রথমে আমরা সূরা আল-বাকারা ২:৪০–৪১-এর দিকে নজর দেব: এখানে কাদের উদ্দেশে কথা বলা হচ্ছে?

৪০ নম্বর আয়াত শুরু হয়েছে “হে বনী ইসরাঈল” বলে। অর্থাৎ আল্লাহ এখানে ইহুদিদের উদ্দেশে কথা বলছেন। কিন্তু ঠিক কোন সময়ের ইহুদিদের—মুহাম্মদের সময়ে বসবাসকারী ইহুদিদের, নাকি আরও আগের যুগের, যেমন মুসার সময়কার ইহুদিদের? ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আর আমি যা নাজিল করেছি, তার প্রতি ঈমান আনো; এটি তোমাদের কাছে [ইতোমধ্যে] যা রয়েছে তার সত্যায়নকারী।” তাদের কাছে যা ছিল, তা ছিল তাদের ধর্মগ্রন্থ—বিশেষভাবে তাওরাত। যদি তাওরাতই তাদের কাছে থাকা ধর্মগ্রন্থ হয়ে থাকে, তাহলে “আমি যা নাজিল করেছি” বলতে এখানে কুরআনকেই বোঝানো হচ্ছে। যেহেতু আল্লাহ এই ইহুদিদের কুরআনের প্রতি ঈমান আনতে নির্দেশ দিচ্ছেন, তাই কুরআন তখন ইতোমধ্যে নাজিল হতে শুরু করেছিল। সুতরাং এখানে যেসব ইহুদির কথা বলা হচ্ছে, তারা অবশ্যই মুহাম্মদের সমসাময়িক ছিলেন।

মুহাম্মদের সমসাময়িক এই ইহুদিদের কেন কুরআনের প্রতি ঈমান আনতে বলা হয়েছিল? কারণ কুরআন তাওরাতে “তাদের কাছে যা ছিল” তা সত্যায়ন করেছিল। এই আয়াতগুলোর ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, মুহাম্মদের সময়ে ইহুদিদের কাছে থাকা তাওরাত অক্ষুণ্ণ ছিল এবং কুরআনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আর সেটি তাদের কাছে মুহাম্মদ যে একজন সত্য নবী, তার প্রমাণ হিসেবেও কাজ করত।

২) সূরা আল-আ‘রাফ — “যাঁর উল্লেখ তারা লিখিত অবস্থায় পায়”

এবার আমরা কুরআনের পরবর্তী অংশ—সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৫৭-এর দিকে নজর দিই:

ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِىَّ ٱلْأُمِّىَّ ٱلَّذِى يَجِدُونَهُۥ مَكْتُوبًاعِندَهُمْ فِى ٱلتَّوْرَىٰةِ وَٱلْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَىٰهُمْ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَـٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ ٱلْخَبَـٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَٱلْأَغْلَـٰلَ ٱلَّتِى كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُوا۟ ٱلنُّورَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ ۙ أُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ

‘যাহারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাওরাত ও ইন্জীল, যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহাতে লিপিবদ্ধ পায়, যে তাহাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে বাধা দেয়, যে তাহাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং যে মুক্ত করে তাহাদেরকে তাহাদের গুরুভার হইতে এবং শৃংখল হইতে যাহা তাহাদের উপর ছিল। সুতরাং যাহারা তাহার প্রতি ঈমান আনে তাহাকে সম্মান করে, তাহাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাহার সঙ্গে অবতীর্ণ হইয়াছে উহার অনুসরণ করে তাহারাই সফলকাম।

– সুরা আল-আ’রাফ ৭:১৫৭ –

আবারও আমাদের প্রশ্ন করতে হবে এখানে কাদের কথা বলা হচ্ছে? এই আয়াতে এমন লোকদের কথা বলা হয়েছে, যাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিল রয়েছে। সুতরাং এখানে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের কথাই বলা হচ্ছে। কিন্তু এই ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কোন সময়ে বসবাস করতেন?

আয়াতে বলা হয়েছে, তারা “রাসূলকে অনুসরণ করে” এখানে রাসূল বলতে মুহাম্মদকে বোঝানো হয়েছে। তাই যাদের কথা এখানে বলা হয়েছে, তারা অবশ্যই মুহাম্মদের সময়ে বসবাসকারী ইহুদি ও খ্রিষ্টান ছিলেন; তাঁর আগের যুগের মানুষ নন। কারণ মুহাম্মদের জন্মের আগে কারও পক্ষে তাঁকে অনুসরণ করা সম্ভব ছিল না। এই আয়াত অনুযায়ী, মুহাম্মদের সময়ে বসবাসকারী এবং তাঁকে অনুসরণকারী আহলে কিতাব তাদের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী খুঁজে পেতে পারতেন।

এ থেকে আমরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি? তাওরাত—অথবা অন্তত তাওরাতের যেসব অংশে মুহাম্মদ সম্পর্কে বলা হয়েছে—সপ্তম শতাব্দীতে সেগুলো অবশ্যই অক্ষুণ্ণ ছিল। তা না হলে মুহাম্মদ তাঁর সমসাময়িকদের বলতে পারতেন না যে, তাদের তাওরাতে তাঁর উল্লেখ বা বর্ণনা রয়েছে।

৩) সূরা আল-মায়িদা “আল্লাহর বিধান”

মদিনায় মুহাম্মদ মুসলিম সমাজের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সমাজের বিভিন্ন বিরোধের বিচার করার দায়িত্বও তাঁর ওপর ছিল এমনকি ইহুদিদের মধ্যকার বিরোধের ক্ষেত্রেও। সূরা আল-মায়িদার ৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন ন্যায়সংগতভাবে তাদের বিচার করেন অথবা তাদের বিরোধে জড়ানো থেকে বিরত থাকেন। এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে:

وَكَيْفَ يُحَكِّمُونَكَ وَعِندَهُمُ ٱلتَّوْرَىٰةُ فِيهَا حُكْمُ ٱللَّهِ ثُمَّ يَتَوَلَّوْنَ مِنۢ بَعْدِ ذَٰلِكَ ۚ وَمَآ أُو۟لَـٰٓئِكَ بِٱلْمُؤْمِنِينَ

তাহারা তোমার উপর কিরূপে বিচারভার ন্যস্ত করিবে অথচ তাহাদের নিকট রহিয়াছে তাওরাত যাহাতে আল্লাহ্ আদেশ আছে? ইহার পরও তাহারা মুখ ফিরাইয়া নেয় এবং উহারা মু’মিন নয়।

– সুরা আল-মায়িদা ৫:৪৩ –

এই আয়াত অনুযায়ী, যেসব ইহুদি মুহাম্মদের কাছে বিচার চাইতে এসেছিল, তাদের নিজেদেরই বিচার করার কথা ছিল। কারণ আল্লাহ তাদের তাওরাত দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তারা বিচার করতে পারত। মুহাম্মদের সময়ে তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে এর তাৎপর্য কী? এর অর্থ হলো, ইহুদিদের কাছে তখন যে তাওরাত ছিল—অথবা অন্তত তাতে থাকা আইন ও বিধানগুলো—সেগুলো অক্ষুণ্ণ ছিল।

এর পরের আয়াতটি সপ্তম শতাব্দীতে তাওরাতে বিদ্যমান আইন ও বিধানের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে:

إِنَّآ أَنزَلْنَا ٱلتَّوْرَىٰةَ فِيهَا هُدًۭى وَنُورٌۭ ۚ يَحْكُمُ بِهَا ٱلنَّبِيُّونَ ٱلَّذِينَ أَسْلَمُوا۟ لِلَّذِينَ هَادُوا۟ وَٱلرَّبَّـٰنِيُّونَ وَٱلْأَحْبَارُ بِمَا ٱسْتُحْفِظُوا۟ مِن كِتَـٰبِ ٱللَّهِ وَكَانُوا۟ عَلَيْهِ شُهَدَآءَ ۚفَلَا تَخْشَوُا۟ ٱلنَّاسَ وَٱخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا۟ بِـَٔايَـٰتِى ثَمَنًۭا قَلِيلًۭا ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَـٰفِرُونَ

নিশ্চয়ই আমি তাওরাত অবতীর্ণ করিয়াছিলাম; উহাতে ছিল পথনির্দেশ ও আলো; নবীগণ, যাহারা আল্লাহ্ অনুগত ছিল তাহারা ইয়াহুদীদেরকে তদনুসারে বিধান দিত, আরও বিধান দিত রাব্বানীগণ এবং বিদ্বানগণ; কারণ তাহাদেরকে আল্লাহ্র কিতাবের রক্ষক করা হইয়াছিল এবং তাহারা ছিল উহার সাক্ষী। সুতরাং মানুষকে ভয় করিও না, আমাকেই ভয় কর এবং আমার আয়াতসমূহ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করিও না। আল্লাহ্ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তদনুসারে যাহারা বিধান দেয় না, তাহারাই কাফির।

– সুরা আল-মায়িদা ৫:৪৪ –

এখানে নিচের তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করুন:

১. তাওরাতকে “হিদায়াত ও আলো” বলা হয়েছে। এই শব্দগুলো এর ঐশী উৎস ও সত্যতার প্রতি ইঙ্গিত করে। কুরআনের অন্যত্র একই ধরনের শব্দ কুরআনের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে।

২. আয়াতে বলা হয়েছে, নবীরা তাওরাতের ভিত্তিতে বিচার করতেন। একটি অবিচ্ছিন্ন শৃঙ্খল যেন একটি নিখুঁত ইসনাদ এর মতো মুসা থেকে ঈসা পর্যন্ত প্রত্যেক নবী তাওরাতের ভিত্তিতে বিচার করেছেন। এটি ইঙ্গিত করে যে, তাওরাতে থাকা আইন ও বিধান নির্ভরযোগ্য ছিল। এই ধারাবাহিকতার বিষয়টি সূরা আল-বাকারা ২:৮৭-এ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে:

৩. সূরা আল-মায়িদা ৫:৪৪-এর শেষাংশে আল্লাহ মুহাম্মদের কাছে আসা ইহুদিদের তিরস্কার করেন, কারণ তারা আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী বিচার করছিল না: “আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা বিচার করে না, তারাই অবিশ্বাসী।” তাওরাতের আইন যদি বিকৃত হয়ে থাকত, তাহলে ইহুদিরা সেই আইন অনুযায়ী বিচার না করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হতো না। এটি দেখায় যে, তাওরাতের আইন ও বিধান শুধু ঈসার সময়েই নয়, মুহাম্মদের সময়েও অক্ষুণ্ণ ছিল।

এরপর সূরা আল-মায়িদায় বলা হয়েছে:

وَكَتَبْنَاعَلَيْهِمْ فِيهَآ أَنَّ ٱلنَّفْسَ بِٱلنَّفْسِ وَٱلْعَيْنَ بِٱلْعَيْنِ وَٱلْأَنفَ بِٱلْأَنفِ وَٱلْأُذُنَ بِٱلْأُذُنِ وَٱلسِّنَّ بِٱلسِّنِّ وَٱلْجُرُوحَ قِصَاصٌۭ ۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِۦ فَهُوَ كَفَّارَةٌۭ لَّهُۥ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ ٤٥

وَقَفَّيْنَا عَلَىٰٓ ءَاثَـٰرِهِم بِعِيسَى ٱبْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًۭا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلتَّوْرَىٰةِ ۖ وَءَاتَيْنَـٰهُ ٱلْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًۭى وَنُورٌۭ وَمُصَدِّقًۭا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلتَّوْرَىٰةِ وَهُدًۭى وَمَوْعِظَةًۭ لِّلْمُتَّقِينَ ٤٦

[৪৫] আমি তাহাদের জন্য উহাতে বিধান দিয়াছিলাম, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম। অতঃপর কেহ উহা ক্ষমা করিলে উহাতে তাহারই পাপ মোচন হইবে। আল্লাহ্ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তদনুসারে যাহারা বিধান দেয় না, তাহারাই জালিম।

[৪৬] মাইয়াম-তনয় ‘ঈসাকে তাহার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের প্রত্যায়নকারীরূপে উহাদের পশ্চাতে প্রেরণ করিয়াছিলাম এবং তাহার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের প্রত্যায়নকারীরূপে এবং মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ ও উপদেশরূপে তাহাকে ইন্জীল দিয়াছিলাম; উহাতে ছিল পথনির্দেশ ও আলো।

– সুরা আল-মায়িদা ৫:৪৫-৪৬ –

এই দুটি আয়াত আমরা উপরে যা আলোচনা করেছি, সেটিই সমর্থন করে।

১. ঈসা যখন এসেছিলেন, তখন তাঁর সময়ে প্রচলিত তাওরাতকে তিনি সত্যায়ন করেছিলেন (আয়াত ৪৬)।

২. মদিনার ইহুদিরা যদি আল্লাহর নাজিল করা বিধান—অর্থাৎ তাওরাত—অনুযায়ী বিচার না করত, তাহলে তারা অন্যায়কারী বলে গণ্য হতো (আয়াত ৪৫)। সুতরাং মদিনার ইহুদিদের কাছে থাকা তাওরাতের আইন ও বিধান অন্তত মুহাম্মদের সময় পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল।

সবগুলো বিষয় একত্রে বিবেচনা করলে, সূরা আল-মায়িদায় সপ্তম শতাব্দীতে তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতার পক্ষে একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

কুরআনের পাশাপাশি হাদিসেও সূরা আল-মায়িদার ৪১–৪৭ নম্বর আয়াতের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যা এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। সহিহ মুসলিমে আমরা এমন একজন ইহুদির ঘটনা পড়ি, যে জিনা করেছিল এবং ইহুদি নেতারা তাকে বেত্রাঘাত ও তার মুখ কালো করার শাস্তি দিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল তাকে দেখে একজন ইহুদি আলেমকে জিজ্ঞাসা করেন, তাওরাতে জিনার জন্য এই শাস্তিই নির্ধারিত আছে কি না। সেই আলেম উত্তর দেন, “না।” এরপর তাওরাতের পাণ্ডুলিপি থেকে নিশ্চিত করা হয় যে, জিনার শাস্তি হিসেবে সেখানে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তখন মুহাম্মদ সেই ব্যক্তিকে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ মুহাম্মদ তাঁর সময়ে প্রচলিত তাওরাতের ভিত্তিতে একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এটি ইঙ্গিত করে যে, সেই তাওরাতে থাকা আইন ও বিধান বিকৃত ছিল না।

৪) সূরা ইউনুস — “তোমার আগে যারা কিতাব পাঠ করে আসছে, তাদের জিজ্ঞাসা করো”

এরপর আমরা সূরা ইউনুস ১০:৯৪-এর দিকে নজর দেব:

فَإِن كُنتَ فِى شَكٍّۢ مِّمَّآ أَنزَلْنَآ إِلَيْكَ فَسْـَٔلِ ٱلَّذِينَ يَقْرَءُونَ ٱلْكِتَـٰبَ مِن قَبْلِكَ ۚ لَقَدْ جَآءَكَ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ ٱلْمُمْتَرِينَ

আমি তোমার প্রতি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছি উহাতে যদি তুমি সন্দেহে থাক তবে তোমার পূর্বের কিতাব যাহারা পাঠ করে তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা কর; তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার নিকট সত্য অবশ্যই আসিয়াছে। তুমি কখনও সন্দিগ্ধচিত্তদের অন্তর্ভুক্ত হইও না,

– সুরা ইউনুস ১০:৯৪ –

ব্যাকরণগতভাবে এই আয়াতটি নবী মুহাম্মদকে সম্বোধন করে বলা হলেও, তাফসিরগুলো এ বিষয়ে একমত যে, এর উদ্দেশ্য ছিল মক্কার সন্দেহপ্রবণ লোকজন এবং বৃহত্তর সমাজকে শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু তারা কোন বিষয়ে সন্দেহ করছিল?

সূরা ইউনুসে নবীদের এমন কয়েকটি কাহিনি উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো প্রথমে তাওরাতে প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন নুহ ও মহাপ্লাবনের ঘটনা (আয়াত ৭১–৭৩) এবং ফিরআউনের সামনে মুসা ও হারুনের ঘটনা (আয়াত ৭৫–৯২)। এ কারণে আলেমদের মতে, মক্কার লোকদের সন্দেহের বিষয় ছিল মুহাম্মদের বর্ণিত নবীদের এসব কাহিনি।

কুরআনে বর্ণিত নবীদের কাহিনি সত্য কি না—এ নিয়ে তাদের সন্দেহ থাকলে কুরআন অনুযায়ী তারা আহলে কিতাবের কাছে জিজ্ঞাসা করতে পারত। তারা যদি বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে চাইত, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে সালামের কাছেও জানতে পারত, যিনি একজন ইহুদি রাব্বি ছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম এবং অন্যান্য ইহুদি সন্দেহকারীদের নিশ্চিত করতে পারতেন যে, কুরআনে উল্লেখিত নবীদের কাহিনিগুলো তাওরাতে বর্ণিত কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মুহাম্মদের সময়ে তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য কী? স্পষ্টতই, সেই সময়ে তাওরাতের পাঠ—অথবা অন্তত তাতে থাকা নবীদের কাহিনিগুলো—অক্ষুণ্ণ ছিল।

________________________________________

এবার আমাদের আলোচনার উপসংহারে আসা যাক। প্রবন্ধের শুরুতে আমরা প্রশ্ন করেছিলাম: “মুহাম্মদের সময়ে, অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে, যে তাওরাত প্রচলিত ছিল, কুরআন কি সেটিকে বিকৃত বলে উল্লেখ করেছে, নাকি নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করেছে?”

সূরা আল-বাকারা ২:৪০–৪১ সেই সময়কার তাওরাতের পাঠের নির্ভরযোগ্যতাকে সাধারণভাবে সমর্থন করে। অন্যদিকে, আমরা যে অন্যান্য আয়াত পর্যালোচনা করেছি, সেগুলো তাওরাতের নির্দিষ্ট কয়েকটি অংশের নির্ভরযোগ্যতাকে সমর্থন করে:

• মুহাম্মদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী (৭:১৫৭)

• আইন ও বিধান (৫:৪৩–৪৭)

• নবীদের কাহিনি (১০:৯৪)

কিছু মুসলিম দাবি করেন যে, কুরআনের নির্দিষ্ট কিছু আয়াতে তাওরাত বিকৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছে কিন্তু আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়।

তাছাড়া, তাওরাতের এই তিনটি অংশের সংরক্ষণ ও নির্ভরযোগ্যতা আমরা এই প্রবন্ধে যে আয়াতগুলো পর্যালোচনা করেছি, সেগুলোর মাধ্যমে সমর্থিত হওয়ায় এগুলো সেই কথিত বিকৃতির দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কথা নয়।

এটি আমাদের সামনে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিয়ে আসে: বর্তমানে আমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে, সেটি কি মুহাম্মদের সময়কার তাওরাতেরই একই পাঠ? এর উত্তর জানতে, প্রিয় পাঠক, আপনাকে পরবর্তী প্রবন্ধটি পড়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি: