কুরআন ও তোরাহ

কুরআন কি শিক্ষা দেয় যে তাওরাত বিকৃত হয়েছিল?

যেসব আয়াতকে কিছু মুসলিম তাওরাত বিকৃত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন, সেগুলোর নিবিড় পর্যালোচনা

মুহাম্মদের সময়ে তাওরাত কি নির্ভরযোগ্য ছিল? আগের প্রবন্ধে আমরা দেখেছি, কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াত অনুযায়ী, সপ্তম শতাব্দীতে মুহাম্মদের সময়ে প্রচলিত তাওরাত—অথবা অন্তত তাওরাতের নির্দিষ্ট কিছু অংশের—নির্ভরযোগ্যতা আল্লাহ নিশ্চিত করেছেন। তারপরও, প্রিয় পাঠক, আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—কুরআনে কি এমন কোনো আয়াতও রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে সেই সময়েই তাওরাত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল? তাওরাতের মূল পাঠ বিকৃত হয়েছে—এই দাবির পক্ষে কুরআনের যে আয়াতটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়, সেটি হলো সূরা আল-বাকারা ২:৭৯।

فَوَيْلٌۭ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ ٱلْكِتَـٰبَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَـٰذَا مِنْ عِندِ ٱللَّهِ لِيَشْتَرُوا۟ بِهِۦ ثَمَنًۭا قَلِيلًۭا ۖ فَوَيْلٌۭ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌۭ لَّهُم مِّمَّا يَكْسِبُونَ

সুতরাং দুর্ভোগ তাহাদের জন্য যাহারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, ‘ইহা আল্লাহ্র নিকট হইতে।’ তাহাদের হাত যাহা রচনা করিয়াছে তাহার জন্য শাস্তি তাহাদের এবং যাহা তাহারা উপার্জন করে তাহার জন্য শাস্তি তাহাদের।

– সুরা আল-বাকারা ২:৭৯ –

কুরআনের বিশিষ্ট মুফাসসির আল-তাবারি এই আয়াতের প্রধান আলোচ্য হিসেবে মদিনার ইহুদি নেতাদের চিহ্নিত করেছেন। এ কারণে কিছু মুসলিম যুক্তি দেন যে, এখানে “কিতাব” বলতে ইহুদিদের কাছে অর্পিত তাওরাতকে বোঝানো হয়েছে। তাই তাদের মতে, এই আয়াত স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে ইহুদিরা তাওরাতের পাঠ বিকৃত করেছিল এবং পরে দাবি করেছিল: “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।” প্রথম দেখায় এই ব্যাখ্যাটি যুক্তিসংগত বলে মনে হতে পারে। তবে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:

১. আয়াতে ইহুদিরা কোন কিতাব লিখেছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তাই এখানে “কিতাব” বলতে তাওরাতকে বোঝানো হয়েছে, নাকি অন্য কোনো গ্রন্থকে—তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

২. আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, কুরআনের মূল আরবি পাঠে “বিকৃত করা” নয়, বরং “লেখা” (كِتَابَة) অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়নি যে, ইহুদিরা তাওরাতের পাঠ নিয়ে সেটিতে পরিবর্তন এনেছিল। বরং সরলভাবে পড়লে বোঝা যায়, তারা তাওরাতের পাশাপাশি নতুন একটি লেখা তৈরি করেছিল এবং পরে সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলে দাবি করেছিল। ইহুদিরা বাস্তবেও এ ধরনের আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেছিল, যার নাম তালমুদ—যেখানে জীবনযাপন ও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে ইহুদি আলেমদের আলোচনা ও বিতর্ক লিপিবদ্ধ রয়েছে। পরবর্তীতে তারা এর জন্য ঐশী কর্তৃত্বের দাবি করেছিল।

তাওরাতের পাশাপাশি আরেকটি গ্রন্থ লিখে সেটিকে ঐশী উৎসসম্পন্ন বলে দাবি করার অর্থ এই নয় যে, তাওরাতের মূল পাঠ পরিবর্তন করা হয়েছিল। কুরআনের আরও বহু আয়াতে তাওরাত সম্পর্কে ইতিবাচক বক্তব্য রয়েছে। তাই তাওরাতের পাঠ সত্যিই পরিবর্তিত হয়েছিল এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও স্পষ্ট কোনো আয়াতের প্রয়োজন হবে।

৩. সূরা আল-বাকারা ২:৭৯-এর প্রেক্ষাপটও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। এর ঠিক আগের আয়াতগুলোতে (৭৫–৭৮) বলা হয়েছে, মুহাম্মদের সময়কার ইহুদিরা তাওরাতে কী লেখা ছিল তা বুঝত এবং সেই বিষয়গুলো মুসলিমদের জানানো উচিত কি না, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করত। তারা তাওরাতে লেখা কিছু বিষয় গোপন করার কথা ভাবছিল। যদি তারা তাওরাতের বক্তব্য বুঝতে পারত, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করত এবং এর কিছু অংশ গোপন করতে চাইত, তাহলে তা ইঙ্গিত করে যে, তাওরাতের সংরক্ষিত পাঠ তখনও বিদ্যমান ছিল।

এ ছাড়া তাফসির অনুযায়ী, ইহুদিরা বিশেষভাবে তাওরাতে মুহাম্মদ সম্পর্কে থাকা ভবিষ্যদ্বাণীগুলো মুসলিমদের কাছ থেকে গোপন করার বিষয়ে আলোচনা করছিল। সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৫৭-এ বলা হয়েছে যে, তাওরাতে এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে:

ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِىَّ ٱلْأُمِّىَّ ٱلَّذِى يَجِدُونَهُۥ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِى ٱلتَّوْرَىٰةِ وَٱلْإِنجِيلِ

‘যাহারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাওরাত ও ইন্জীল, যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহাতে লিপিবদ্ধ পায়, […]

– সুরা আল-আ’রাফ ৭:১৫৭ –

মুহাম্মদের সময়কার, অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীর ইহুদিরা যদি তাওরাতে থাকা ভবিষ্যদ্বাণীগুলো গোপন করার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সেই সময় পর্যন্ত ওই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো তাওরাতে বিদ্যমান ছিল তা না হলে সেগুলো গোপন করার চেষ্টা করাই সম্ভব হতো না। সুতরাং তাওরাত—অথবা অন্তত তাতে থাকা এসব ভবিষ্যদ্বাণী—মুহাম্মদের সময় পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। একই সঙ্গে, সূরা আল-বাকারা ২:৭৯-এ এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই যে, তাওরাতের অন্যান্য অংশ—যেমন নবীদের কাহিনি—বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।

অতএব, সূরা আল-বাকারা ২:৭৯ এই শিক্ষা দেয় না যে মুহাম্মদের সময়ে তাওরাতের পাঠ অনির্ভরযোগ্য ছিল। বরং এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয়াতটি উল্টো দিকেই ইঙ্গিত করে—সপ্তম শতাব্দীতে তাওরাতের নির্ভরযোগ্যতাকে অস্বীকার না করে বরং তা সমর্থন করে।

________________________________________

তাওরাতের পাঠ বিকৃত হওয়ার পক্ষে আরেকটি আয়াত প্রায়ই উল্লেখ করা হয় সূরা আল-মায়িদা ৫:১৩। ইহুদিদের সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে:

فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَـٰقَهُمْ لَعَنَّـٰهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَـٰسِيَةًۭ ۖ يُحَرِّفُونَ ٱلْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِۦ ۙ وَنَسُوا۟ حَظًّۭا مِّمَّا ذُكِّرُوا۟ بِهِۦ

তাহাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য আমি তাহাদেরকে লা’নত করিয়াছি ও তাহাদের হৃদয় কঠিন করিয়াছি; তাহারা শব্দগুলির আসল অর্থ বিকৃত করে এবং তাহারা যাহা উপদিষ্ট হইয়াছিল উহার এক অংশ ভুলিয়া গিয়াছে।

– সুরা আল-মায়িদা ৫:১৩ –

কিছু মুসলিম যুক্তি দেন যে, “তারা শব্দগুলোকে সেগুলোর যথাযথ স্থান থেকে বিকৃত করে” এই বাক্যটি তাওরাতের লিখিত পাঠকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ তাদের মতে, ইহুদিরা কিতাবের লিখিত শব্দগুলো পরিবর্তন করেছিল। তারা আরও যুক্তি দেন যে, “তাদের যা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার একটি অংশ তারা ভুলে গেছে” এই কথার অর্থ হলো, তাওরাত অনুলিপি করার সময় ইহুদিরা এর কিছু অংশ বাদ দিয়েছিল। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অংশগুলো হারিয়ে যায়।

তবে এখানে আমাদের নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে:

১. আয়াতটিতে বলা হয়নি যে ইহুদিরা তাওরাতের মূল পাঠ বিকৃত করেছিল। বক্তব্যটি সুনির্দিষ্ট নয়; এমনকি এখানে সরাসরি তাওরাতের নামও উল্লেখ করা হয়নি।

২. আগের প্রবন্ধে আমরা যেমন দেখেছি, একই সূরার মাত্র কয়েকটি আয়াত পরে মুহাম্মদের সময়ে প্রচলিত তাওরাতের মধ্যে “আল্লাহর বিধান” রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে (৫:৪৩)। আল্লাহ আহলে কিতাবকে সেই সময়ে বিদ্যমান তাওরাতের বিধান মেনে চলতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা তা অনুসরণ করে না, তাদের “অবিশ্বাসী” (৫:৪৩–৪৪) ও “অন্যায়কারী” (৫:৪৫) বলা হয়েছে। তাই সূরা আল-মায়িদা ৫:১৩ দ্বারা সম্ভবত তাওরাতের মূল পাঠ বিকৃত হওয়ার কথা বোঝানো হয়নি।

মুহাম্মদের কয়েকজন সাহাবি এবং ধ্রুপদি যুগের ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিকরাও যুক্তি দিয়েছেন যে, “তারা শব্দগুলোকে সেগুলোর যথাযথ স্থান থেকে বিকৃত করে”—এই কথার অর্থ এই নয় যে ইহুদিরা তাওরাতের লিখিত পাঠ পরিবর্তন করেছিল। বরং তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইহুদিরা তাওরাতের বক্তব্যের অর্থের ভুল ব্যাখ্যা করেছিল। তাওরাতের মূল পাঠ অক্ষুণ্ণ ছিল, কিন্তু তারা কিছু আয়াতকে সেগুলোর যথাযথ প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যাখ্যা করেছিল এবং এভাবে পাঠের প্রকৃত অর্থকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছিল।

একইভাবে আমাদের সূরা আন-নিসা ৪:৪৬-এর মতো আয়াতগুলোকেও বুঝতে হবে, যেখানে বলা হয়েছে:

مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُوا۟ يُحَرِّفُونَ ٱلْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ

ইয়াহূদীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক কথাগুলি স্থানচ্যুত করিয়া বিকৃত করে”

– সুরা আন-নিসা ৪:৪৬ –

অথবা সূরা আলে ইমরান ৩:৭৮-এ বলা হয়েছে:

وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًۭا يَلْوُۥنَ أَلْسِنَتَهُم بِٱلْكِتَـٰبِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ ٱلْكِتَـٰبِ وَمَا هُوَ مِنَ ٱلْكِتَـٰبِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

আর নিশ্চয়ই তাহাদের মধ্যে একদল লোক আছেই যাহারা কিতাবকে জিহ্বা দ্বারা বিকৃত করে যাহাতে তোমরা উহাকে আল্লাহ্ কিতাবের অংশ মনে কর; কিন্তু উহা কিতাবের অংশ নহে এবং তাহারা বলে, ‘উহা আল্লাহ্র পক্ষ হইতে’, কিন্তু উহা আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রেরিত নহে। তাহারা জানিয়া-শুনিয়া আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা বলে।

– সুরা আলে-ইমরান ৩:৭৮ –

এই আয়াতগুলোতে কুরআন যা বলছে তা হলো, কিছু ইহুদি মৌখিকভাবে তাওরাতের শিক্ষাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করত। তারা তাওরাতকে তাদের জিহ্বা দিয়ে বিকৃত করত, হাত দিয়ে নয়! অর্থাৎ তারা তাওরাতের লিখিত পাঠ পরিবর্তন না করে এর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করত। একই ধরনের ঘটনা শুক্রবার কোনো মসজিদেও ঘটতে পারে। কোনো বিদআতপন্থী ইমাম এমন একটি খুতবা দিতে পারেন, যা কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি যদি তা করেন, তাহলে তিনি কুরআনের মূল পাঠ পরিবর্তন করছেন না; বরং কুরআনের বক্তব্যের অর্থকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন।

সবগুলো আয়াত একত্রে বিবেচনা করলে আমাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয় যে, কুরআনের এসব আয়াত শিক্ষা দেয় মুহাম্মদের সময়ে কিছু ইহুদি তাওরাতের পাঠের ভুল ব্যাখ্যা করেছিল এবং এর ফলে এর মূল অর্থকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু চামড়ার পাণ্ডুলিপিতে লেখা তাওরাতের প্রকৃত শব্দগুলো পুনর্লিখন বা পরিবর্তন করা হয়েছিল এমন প্রমাণ কুরআনে পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে কুরআনের বক্তব্যে ধারাবাহিকতা রয়েছে। একদিকে মুহাম্মদের সময়কার তাওরাত বিকৃত ছিল এবং অন্যদিকে সেটি নির্ভরযোগ্য ছিল—কুরআন এমন পরস্পরবিরোধী শিক্ষা দেয় না, যেমনটি আমরা আগের প্রবন্ধে আলোচনা করেছি। বরং কুরআনের সামগ্রিক বক্তব্য থেকে যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো—সপ্তম শতাব্দীতে ইহুদিদের কাছে যে তাওরাত ছিল, অথবা অন্তত তার একটি বড় অংশ, তা ছিল আল্লাহর নির্ভরযোগ্য, অবিকৃত ও পবিত্র ওহি।

________________________________________

কুরআনের ভেতরের এসব প্রমাণ ছাড়াও স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন আসে ইহুদিদের পক্ষে তাওরাতের পাঠ সর্বত্র একইভাবে পরিবর্তন করা আদৌ কীভাবে সম্ভব হতো? আমাদের মনে রাখতে হবে, মুহাম্মদের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগেই তাওরাতের শত শত অনুলিপি বিদ্যমান ছিল। এগুলো ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে ইহুদিদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী অভিবাসন করে বসতি স্থাপন করেছিল (নিচের চিত্র ১ দেখুন)। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী ইহুদিরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলত এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব সম্প্রদায় একে অপরকে প্রত্যাখ্যানও করত। তাহলে তারা কীভাবে একযোগে সহযোগিতা করে তাদের কাছে থাকা তাওরাতের সব অনুলিপি পরিবর্তন করতে পারত? আর তারা কেনই-বা এমনটি করত?

পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা যেমন দেখব, তাওরাতের এমন বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন সময়ে লেখা হয়েছিল এবং এমনকি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিতও হয়েছিল। তারপরও এসব পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু মূলত একই রকম। তাহলে বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলা এবং অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের বিরোধী ইহুদিরা কীভাবে গোপনে তাওরাতের শত শত অনুলিপি একইভাবে পরিবর্তন ও জাল করতে পারত—তাও আবার এর পক্ষে সামান্যতম প্রমাণও রেখে না গিয়ে? আর এসব কিছুই ঘটতে হতো ইন্টারনেট আবিষ্কারের বহু শতাব্দী আগে!

![]( “চিত্র ১: আনুমানিক ৬০০–৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিস্তার।”)

এই সমস্ত প্রমাণ আমাদের এমন একটি সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায় যে, সপ্তম শতাব্দীতে প্রচলিত তাওরাত—অথবা অন্তত তাতে থাকা মুহাম্মদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী, আইন ও বিধান এবং নবীদের কাহিনি—নির্ভরযোগ্য ছিল। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: সপ্তম শতাব্দীতে যে অবিকৃত ও নির্ভরযোগ্য তাওরাত প্রচলিত ছিল, তাতে আসলে কী লেখা ছিল—তা কি আজ আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব? যদি তা জানা সম্ভব না হয়, তাহলে এ পর্যন্ত আমাদের পুরো আলোচনাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। কারণ কেউ বলতে পারেন: “হ্যাঁ, মুহাম্মদের সময়ে তাওরাত অক্ষুণ্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর সময়ের পরে মানুষ সেটিকে বিকৃত করেছে!” যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় আজও আমাদের কাছে একটি বিকৃত তাওরাতই রয়েছে!

প্রিয় পাঠক, সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো—মুহাম্মদের সময়ে এবং তাঁরও আগে তাওরাতের পাঠে কী লেখা ছিল, তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব! বিষয়টি জানতে অনুগ্রহ করে পরবর্তী প্রবন্ধটি পড়ুন: