কুরআন ও তোরাহ

বর্তমান তাওরাত কি মুহাম্মদের সময়কার তাওরাতেরই একই পাঠ?

তাওরাত সংরক্ষণ সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ কী বলে

আগের প্রবন্ধগুলোতে “মুহাম্মদের সময়ে কি তাওরাত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল?” এবং “কুরআন কি শিক্ষা দেয় যে তাওরাত বিকৃত হয়েছিল?” আমরা দেখেছি যে, সপ্তম শতাব্দীর তাওরাত, অথবা অন্তত তাওরাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, নির্ভরযোগ্য ছিল। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: সেই তাওরাতের পাঠে কী লেখা ছিল, তা কি আজ আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব? যদি তা জানা সম্ভব না হয়, তাহলে এ পর্যন্ত আমাদের পুরো আলোচনাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। কারণ কেউ বলতে পারেন, “হ্যাঁ, মুহাম্মদের সময়ে তাওরাত অক্ষুণ্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর সময়ের পরে মানুষ সেটিকে বিকৃত করেছে!” যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়—আজও আমাদের কাছে একটি বিকৃত তাওরাতই রয়েছে!

অবিকৃত তাওরাতে কী লেখা ছিল তা জানতে হলে আমাদের এমন তাওরাতের অনুলিপি প্রয়োজন, যেগুলো মুহাম্মদের সময়কার অথবা তাঁরও আগের। এ ধরনের পাণ্ডুলিপি যদি আমাদের কাছে থাকে, তাহলে মুহাম্মদের সময়ে প্রচলিত ও তাঁর কাছে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত তাওরাতের পাঠ কী ছিল, তা আমরা জানতে পারব এবং সেই পাঠের ওপর আমরাও আস্থা রাখতে পারব। কিন্তু আমাদের কাছে কি সত্যিই এমন প্রাচীন অনুলিপি রয়েছে?

১৯৪৭ সালে দুইজন বেদুইন রাখাল সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেন। মৃত সাগরের কাছে পশ্চিম তীরের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি গুহায় তারা ইহুদি ধর্মগ্রন্থের প্রাচীন হিব্রু পাণ্ডুলিপি খুঁজে পান, যেগুলো মুহাম্মদের সময়ের কয়েক শতাব্দী আগের। এসব পাণ্ডুলিপি ডেড সি স্ক্রলস বা মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি নামে পরিচিত (নিচের চিত্র ১ দেখুন)। এগুলোর মধ্যে তাওরাতের বিভিন্ন অংশও রয়েছে।

প্রাথমিক আবিষ্কারের পর প্রত্নতাত্ত্বিকরা তাওরাতের আরও বহু প্রাচীন অনুলিপি আবিষ্কার করেন। সবগুলো একত্রে বিবেচনা করলে এসব পাণ্ডুলিপিতে তাওরাতের একটি বড় অংশ সংরক্ষিত রয়েছে।

![]( “চিত্র ১: মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপি। ক) যেসব গুহায় মৃত সাগরের পাণ্ডুলিপিগুলোর বিভিন্ন অনুলিপি পাওয়া গেছে, তার কয়েকটির ছবি; খ) তাওরাতে বর্ণিত ইউসুফের কাহিনির একটি খণ্ডাংশ (আদিপুস্তক ৪৮); গ) তাওরাতের ইহুদি আইনের একটি অংশ (লেবীয় পুস্তক ২২ এবং পরবর্তী অংশ)। ”)

প্রত্নতাত্ত্বিকরা তাওরাতের গ্রিক অনুবাদের সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপিও খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলো মুহাম্মদের সময়ের কয়েক শতাব্দী আগের। এ ছাড়া তাওরাতের প্রাচীন সিরিয়াক অনুবাদের অনুলিপিও পাওয়া গেছে। এসব পাণ্ডুলিপির সময়কাল আনুমানিকভাবে মুহাম্মদের জীবদ্দশার সমসাময়িক অথবা তারও আগের। মুহাম্মদের জন্মের আগে, তাঁর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর কয়েক শতাব্দী পরে লেখা তাওরাতের পাণ্ডুলিপিগুলো যখন আমরা পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করি, তখন সেগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর মিল দেখতে পাই (নিচের চিত্র ২ দেখুন)। যদিও কিছু ছোটখাটো পার্থক্য রয়েছে, এসব পার্থক্যের অধিকাংশই পাণ্ডুলিপি অনুলিপি ও এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পাঠ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। এগুলো তাওরাতের কোনো প্রধান ঐতিহাসিক বা ধর্মতাত্ত্বিক দাবিকে প্রভাবিত করে না। এটি দেখায় যে, ইহুদি লিপিকাররা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাওরাতের পাঠ সংরক্ষণ করেছিলেন।

![]( “চিত্র ২: ঈসার সময় থেকে শুরু করে মুহাম্মদের মৃত্যুর কয়েক শতাব্দী পর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের তাওরাতের নির্বাচিত কয়েকটি অনুলিপি। এসব অনুলিপি পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সময়ের ধারাবাহিকতায় তাওরাতের পাঠ মূলত একই রয়ে গেছে।”)

বর্তমানে তাওরাতের যেসব আধুনিক অনুবাদ আমরা পড়ি, সেগুলো চিত্র ২-এ দেখানো এ ধরনের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই আজও আমরা এমন একটি তাওরাত পড়তে পারি, যা সপ্তম শতাব্দীতে প্রচলিত সেই তাওরাতের পাঠকে প্রতিফলিত করে—যে তাওরাতের উল্লেখ কুরআনে রয়েছে এবং যাকে কুরআন নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেয়।

________________________________________

আমাদের ভূমিকা প্রবন্ধে যেমনটি ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, কুরআন তাওরাতের দিকে এমন একটি প্রমাণ হিসেবে নির্দেশ করে, যার মাধ্যমে দেখানো যায় যে কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সত্য ওহি এবং মুহাম্মদ একজন সত্য নবী।

সূরা ইউসুফ ১২:১১১ এমন একটি উপায় তুলে ধরে, যার মাধ্যমে কুরআনের তাওরাতকে সত্যায়ন করার এবং মুহাম্মদ যে সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছিলেন, তা প্রমাণিত হওয়ার কথা:

لَقَدْ كَانَ فِى قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌۭ لِّأُو۟لِى ٱلْأَلْبَـٰبِ ۗ مَا كَانَ حَدِيثًۭا يُفْتَرَىٰ وَلَـٰكِن تَصْدِيقَ ٱلَّذِى بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَىْءٍۢ وَهُدًۭى وَرَحْمَةًۭ لِّقَوْمٍۢ يُؤْمِنُونَ

উহাদের বৃত্তান্তে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। ইহা এমন বাণী যাহা মিথ্যা রচনা নয়। কিন্তু মু’মিনদের জন্য ইহা পূর্বগ্রন্থে যাহা আছে তাহার প্রত্যয়ন এবং সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত।

– সুরা ইউসুফ ১২:১১১ –

এখানে কুরআন বলে যে, নবীদের কাহিনির বিস্তারিত বিবরণের ক্ষেত্রেও এটি তাওরাতকে সত্যায়ন করে। সুতরাং কুরআনে বর্ণিত নবীদের কাহিনির সঙ্গে তাওরাতে বর্ণিত একই কাহিনি তুলনা করলে আমাদের প্রত্যাশা করা উচিত যে, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণও পরস্পরের সঙ্গে মিলবে—অথবা অন্তত একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। যদি কাহিনিগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে তা মুহাম্মদ যে একজন সত্য নবী, তার প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে। তিনি নিরক্ষর হওয়ায় নিজে তাওরাত পড়তে না পারা সত্ত্বেও যদি এসব কাহিনির বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন, তাহলে তা দেখাবে যে, তিনি অবশ্যই ঐশী প্রত্যাদেশের মাধ্যমে এই জ্ঞান লাভ করেছিলেন। এবার চলুন, উভয় গ্রন্থে বর্ণিত “সর্বোত্তম কাহিনি”—ইউসুফের কাহিনি—তুলনা করে বিষয়টি যাচাই করি: